Designed by shamsuddin noman

Skip to Content

আবার ভারত বিরোধিতায় বিএনপি

আবার ভারত বিরোধিতায় বিএনপি

Closed

সাজ্জাদ হায়দার: সূত্রমতে, বিএনপি নাকি এখন থেকে ভারতবিরোধী রাজনীতি শুরু করবে। সম্প্রতি বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান খান বলেছেন, ভারতের কাশ্মির প্রশ্নে তারা সরকারের অবস্থানের সঙ্গে একমত নন। দলটি কাশ্মিরি জনগণ, তথা কাশ্মিরের স্বাধীনতার পক্ষে। তিনি আরও বলেছেন, ভারত বাংলাদেশে গণতন্ত্র হত্যায় সহযোগিতা করছে। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, বিএনপি এখন ভারতবিরোধী ইস্যুগুলো সামনে নিয়ে আসবে। কয়েক বছর আগে দলটি ভারত ইস্যুকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল।

ভারতে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি নেতা-কর্মীদের মধ্যে ভারত-প্রীতি, তথা মোদি-প্রীতি লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে, ২০১৫ সালে বিএনপি আহূত অবোরোধ চলাকালে, খালেদা জিয়া তার কার্যালয়ে অবরুদ্ধ হলে, বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির সাধারণ সম্পাদক অমিত শাহ খালেদা জিয়াকে ফোন করেছেন, সহানুভূতি জানিয়েছেন। এই টেলিফোনের বিষয়টি বিএনপির পক্ষ থেকে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে মিডিয়াকে জানানো হয়।
রাজনীতির মাঠে এই ফোনালাপ নিয়ে নানা বির্তক ও হিসাব-নিকাশ চলতে থাকে। বিএনপিবিরোধী শিবির থেকে এমনও দাবি করা হয়, অমিত শাহ আদৌ খালেদা জিয়াকে ফোন করেননি। এই পুরো ব্যাপারটিতে বিএনপির ভারত-প্রীতি ফুটে ওঠে। টেলিফোন ইস্যুতে বিএনপির প্রচার চালানো ভারতনির্ভরতার প্রমাণ দেয়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময় খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎ বিএনপির জন্য স্বস্তি বয়ে আনে। বিএনপির ভেতরে আশা জাগে যে, নুতন নির্বাচন অনুষ্ঠানে মোদি হাসিনা সরকারকে চাপ দেবেন। কিন্তু মোদির কাছ থেকে ওই ধরনের কোনো প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি। তারপর অনেক পানি গড়িয়েছে, ভারতের ব্যাপারে এখন বোধ হয় দলটি হতাশ।

ধারণা করা হচ্ছে, এই হতাশা থেকেই বিএনপি আবার নুতন করে ভারতবিরোধী ইস্যুগুলোকে সামনে আনার কৌশল গ্রহণ করেছে। সূত্র মতে, বিএনপি ভারত বিরোধিতার পাশাপাশি মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোটের সমর্থন ও সহানুভূতি অর্জনের চেষ্টা করবে, যাতে আগামীতে দলটির পক্ষে ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব হয়।

সত্তরের দশকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পরই এদেশে ভারত বিরোধী রাজনীতির সূত্রপাত। বিশ্ব রাজনীতিও ছিল এই বিরোধিতার অন্যতম কারণ। সেই সময় বিশ্ব দুই পরাশক্তিতে বিভক্ত ছিল। একদিকে সোভিয়েত ব্লক অন্যদিকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোট। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ভারত সোভিয়েত ব্লকে চলে যায়। সুতরাং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পশ্চিমা জোটের আনুকূল্য পেতে ভারত বিরোধিতা অন্যতম শর্তে পরিণত হয়। সেই সময় কিছু কিছু কারণে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে।

ওই সময়ই ভারত ফারাক্কা বাঁধ চালু করলে বাংলাদেশের বিশাল এলাকায় মরুকরণ শুরু হয়। ছিটমহল সমস্যাসহ সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা, ভারত কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় ইত্যাদি বিষয় ভারত বিরোধিতাকে উস্কে দেয়। বাংলাদেশের জনগণের এক বিশাল অংশ ভারতবিরোধী হয়ে উঠে। মধ্য ডানপন্থী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর বিএনপি ভারতবিরোধী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। এদের সঙ্গে যুক্ত হয় চরম ডানপন্থী শক্তিগুলো, যারা একাত্তরে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। সুতরাং রাজনীতির মাঠে, আওয়ামী লীগ বিরোধী হিসেবে পরিচিত ভারতবিরোধী এক শক্তিশালী প্লাটফমর্ দাঁড়িয়ে যায়।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ভারতের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন ঘটে। এতকাল সোভিয়েত অনুকরণে চালিত নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির বদলে ভারতে শুরু হয় মুক্ত বাজার অর্থনীতি। শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বন্ধুত্বের যুগ। অতীতের টানা-পোড়ন ঝেরে দুই দেশ ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিণত হয়। সুতরাং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, এখন ভারতবিরোধী হলেই যে যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূল্য পাওয়া যাবে যেমন ঠিক নয়, তেমনি ভারতের পক্ষে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের সুনজরে থাকা যাবে না- এটাও ঠিক নয়।

ধরা যাক কাশ্মির ইস্যুতে বিএনপি ভারত বিরোধিতা করবে। কিন্তু কাশ্মির প্রশ্নে পশ্চিমাদেশগুলোর অবস্থান কি? তারা কি কাশ্মিরের বিচ্ছিন্নতাবাদকে স্বাধীনতার লড়াই হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে? ভারতের সঙ্গে পশ্চিমাদের স্বার্থের সর্ম্পক কাশ্মির সমস্যার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।

সুতরাং সত্তর দশকের ভারত বিরোধিতা আর বর্তমান সময়ের ভারত বিরোধিতা এক নয়। বর্তমান প্রজন্ম আর সত্তর দশকের প্রজন্ম এক নয়। মোটা দাগের ‘ভারতবিরোধী’কিংবা ‘ভারত-পন্থি’শব্দগুলোর উৎপত্তি সেই সত্তর দশকে। বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনগুলোর প্রচার-প্রপাগন্ডায় এই শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়।

দেখা গেছে, ভারতপন্থী অথবা ভারতবিরোধী যে দলই অতীতে সরকারে এসেছে, সেই দলই ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে সচেষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিটি সরকার প্রধান ভারত সফরে গেছেন। অন্যদিকে, ইন্দিরা গান্ধী থেকে শুরু করে নরেন্দ্র মোদি পর্যন্ত, ভারতের প্রায় সব প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। ‘ভারতবিরোধী’ রাজনীতির ছায়া কোথাও দেখা যায়নি। বরং ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোরারজী দেশাই যখন ঢাকা সফরে আসেন তখন জিয়াউর রহমানের সরকার ধর্মীয় বাণী সংবলিত অনেক বিলবোর্ড রাস্তা থেকে সরিয়ে ফেলে।

বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশই প্রতিবেশী দেশকে উপেক্ষা করতে পারে না। সংঘাতের পরিবর্তে সমঝোতাই বর্তমান বিশ্বে গ্রহণযোগ্য সমাধান। পাকিস্তানের ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট আর বাংলাদেশের ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট এক নয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মসজিদে উলু ধ্বনি শোনা যাবে কিংবা বাংলাদেশ সিকিম ভুটানের (ভুটান স্বাধীন রাষ্ট্র) মতো ভারতের করদ রাজ্য হয়ে যাবে, এ জাতীয় প্রচারণা এখন আর কাজে লাগবে না। ভারতবিরোধী রাজনীতি করতে হলে বলতে হবে কি কারণে ভারতের পক্ষে অথবা বিপক্ষে থাকতে হবে।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশে যেমন সহযোগিতার বিশাল ক্ষেত্র রয়েছে তেমনি বহুমুখী সমস্যাও রয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে বেশ কয়েকটি বড় সমস্যার সমাধান হয়েছে। যেমন ছিটমহল সমস্যা, ফারাক্কা পানি বণ্টন ও সামুদ্রিক সীমানা নির্ধারণ। এ সব সমস্যা সমাধান, বিএনপির যদি মনঃপূত না হয়, তবে সুনির্দিষ্ট করে বলতে হবে। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে এ সব ক্ষেত্রে করণীয় কী হবে সেটাও বলতে হবে। ভারতকে ট্রানজিট প্রদানের বিষয়টিও স্পষ্ট করতে হবে। তবে সূত্রমতে, বিএনপি মাঠে যাই বলুক, ট্রানজিট প্রসঙ্গে তাদের আপত্তির কথা ভারতের সরকারি মহলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি।

কেউ কেউ মনে করেন, বিএনপির ‘ভারতবিরোধী’ কথাবার্তা রাজনীতির মাঠ গরম রাখার চেষ্টা মাত্র। বিএনপির ভারত বিরোধিতা আগামী সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে ছকে বাধা হয়েছে। উদ্দেশ্য ‘ভারতবিরোধী’ ভোট নিজ বাক্সে ভরা।

সময়ই বলে দেবে বিএনপির ‘ভারতবিরোধী’ রাজনীতির চূড়ান্ত পরিণতি!jamunanews24-com_bnp

Previous
Next