Designed by shamsuddin noman

Skip to Content

কোম্পানীগঞ্জে ভূমিহীনের জায়গা দখল করে মুরগির খামার নির্মাণ বর্জের দুর্গন্ধে রোগাক্রান্ত শতশত বাসিন্দা, ৩ জনের মৃত্যুর অভিযোগ

কোম্পানীগঞ্জে ভূমিহীনের জায়গা দখল করে মুরগির খামার নির্মাণ বর্জের দুর্গন্ধে রোগাক্রান্ত শতশত বাসিন্দা, ৩ জনের মৃত্যুর অভিযোগ

Closed

 

বিশেষ প্রতিবেদক

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ৮নং চরএলাহী ইউনিয়নের গাংচিল আদর্শগ্রামে এ.এম এবং থ্রি স্টার নামের দুটি মুরগির খামারের বর্জের দুর্গন্ধে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে শত শত বাসিন্দা। একই এলাকায় পাশাপাশি দুটি খামারের বর্জের দুর্গন্ধ ও বিষক্রীয়ায় ডাইরিয়া, হাপানি, চর্ম ও শ্বাসকষ্টজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে আশপাশের বাসিন্দারা। এতে খামার সংলগ্ন দুই শিশুসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে বলেও অভিযোগ ভূক্তভোগী পরিবারের। ভূমিহীনের ভূয়া কাগজপত্র দেখিয়ে সরকারি জায়গা দখল করে এসব খামার নির্মাণেরও অভিযোগ রয়েছে খামারির বিরুদ্ধে।

সম্প্রতি সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, ইউনিয়নের গাংচিলের ৮নং ওয়ার্ডস্থ আদর্শগ্রামে সাইনবোর্ডহীন দুইটি মুরগির খামার। দুটি খামারে নতুন করে ৫টি বড় শেডের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। চলমান রয়েছে ৩টি শেড। চলমান শেড তিনটিতে প্রায় ৯ হাজার লেয়ার মুরগির ডিম উৎপাদিত হচ্ছে। শেডগুলোর বর্জ আশপাশের পুকুরে গিয়ে পানিকে বিবর্ণ করে তুলেছে। খামার এলাকা খোলা হওয়ায় যত্রতত্র পড়ে রয়েছে মৃত মুরগি। খামারের ভিতরে ও আশপাশের ছোট ছোট বেশ কিছু পুকুর-ডোবা, সংযুক্ত বাড়ির পুকুরগুলো ও আশপাশের বসত বাড়ি জুড়ে মাছি ও মশার উপদ্রপ চোখে পড়েছে।

মুরগির বর্জ পরিশোধন ও জীবানু নাশকতার বিষয়ে কথা হয় পল্ট্রি ফার্ম, হ্যাচারি ও ফিড ফ্যাক্টরি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ (ভেটেরিনেরী) ডা. মো. ইসমাইল হোসেন’র সঙ্গে। তিনি নোয়াখালী প্রতিদিনকে বলেন, মুরগির বর্জে বিষক্রীয়া সৃষ্টি হয়। তা বাতাসে মিশে পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য বিনষ্ট করে। বর্জে মানবদেহের ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া থাকে। সুতরাং একটি খামার গড়ে তোলার সঙ্গে সঙ্গে বর্জ পরিশোধন ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত। বাজারে দেশীয় কোম্পানীর বিভিন্ন জীবানুনাশক ঔষধ রয়েছে। স্বল্প মূল্যের এসব ঔষধ ব্যবহার করলে অপকারী ব্যাকটেরিয়া নষ্ট হয়। লিকুয়েট এসব ঔষধ পানির সঙ্গে মিশ্রিত করে ব্যবহার করলে পরিবেশ দুর্গন্ধ মুক্ত হওয়ার পাশাপাশি, রোগবালাইও কাছে ভীড়ার কথা নয়।

ভূক্তভোগী বাসিন্দা সালা উদ্দিন জানান, তার ও তার বড় ভাইয়ের পাশাপাশি বাড়ি। আর ওই দুই বাড়ি ঘেঁষে থ্রি স্টার নামের একটি মুরগির শেড চলমান রয়েছে। ওই শেডের মুরগির বর্জ বর্ষায় তাদের পুকুরে পড়ে। শুষ্ক মৌসুমেও তাদের চলাচলের পথ ঘেঁষে নির্মিত ড্রেণ দিয়ে বর্জগুলো ছড়িয়ে পড়ছে। এ বর্জে তীব্র দুর্গন্ধে পরিবারের সদস্যদের পেট ফুলে যায়। তার ৭ ছেলে ও ২ মেয়ে গত ৩-৪ মাস শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে ভূগছে। ডাইরিয়া ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিয়ে চলতি মাসের ১০ এপ্রিল তার ৬ বছরের মেয়ে তানিয়া বেগম মারা যায়। এ জন্য তিনি খামারের বর্জ অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন।

সালা উদ্দিনের বড় ভাই ইউনুছ মিয়া বলেন, প্রায় দেড় বছর পূর্বে নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার আল-মামুন এবং সুরুজ মিয়া ও মাফুজ স্থানীয় বাসিন্দাদের বসত বাড়ি সংলগ্ন একটি মুরগির খামার করেন। নিজের বসত বাড়ি ঘেঁষে তৈরী হওয় ঔই খামারের মুরগির বর্জের দুর্গন্ধ অসহনিয় রূপ ধারণ করেছে। একই সঙ্গে বর্জের বিষাক্ত পানি বর্ষা মৌসুমে বাড়ির পুকুরে পড়ছে। মশা-মাছির উপদ্রপ বেড়েছে। দেখা যায় মশা-মাছির মাধ্যমে পানি ও খাওয়ারে জীবানু আক্রান্ত হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ এ খামার নির্মাণ করার সময় নিষেধ করা হলেও প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের নিষেধ উপেক্ষা করেছে মালিক পক্ষ। এমন কি বিভিন্ন সময় চড়াও হয়েছে তাদের উপর।

তিনি আরো অভিযোগ করে বলেন, এই খামারের বর্জের বিষক্রীয়ার শিকার হয়ে গত বছরের শেষের দিকে তাঁর স্ত্রী হাজেরা খাতুন শ্বাসকষ্ট জনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। চলতি মাসের মার্চের দিকে তার ৫ বছরের শিশু কন্যা ডাইরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।
একই মালিকের পার্শ্ববর্তী অপর খামার সংলগ্ন বাসিন্দা ফজর বানু জানান, গত ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে আদর্শ গ্রামের ৩৬নং মৌজার ৪নং সিটে ২ একর জমিতে তিনি দখল আছেন। ২০০৩ সালের দিকে সরকার তাকে ওই জমি বন্দোবস্ত দিয়েছেন। কিন্তু হঠাৎ করে আল-মামুন এসে ওই জায়গা তার দাবী করে জোর করে বেশ কিছু জায়গা দখল করে নেয়। এ নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা হলেও খামার মালিক প্রভাবশালী হওয়ায় কোনো প্রতিকার পায়নি তিনি। তার জায়গা দখল করে সেখানে মুরগির ফার্ম নির্মাণ করা হয়েছে। একই কথা জানালেন স্থানীয় আজহার মিয়া, জামান ও রৌশন আরা। তাদের দাবী দীর্ঘদিন বসত বাড়ি করে বসবাস করার পর হঠাৎ ভূয়া কাগজ দেখিয়ে জায়গার মালিক দাবী করেন আল-মামুন। বেশ কিছু জায়গা জোর পূর্বক দখল করেছে ফার্ম মালিক। একদিকে জায়গা দখল করেছে। অপর দিকে তাদের খামারের দুর্গন্ধে অতিষ্ট হয়ে পড়েছেন বাসিন্দারা।

সুফিয়া বেগম (৪৫) জানান, গত ২৫ বছরেরও বেশি সময় তিনি এ গ্রামে বসবাস করছেন। কখনও মশা ও মাছির এত উপদ্রপ দেখেননি। কিন্তু এখানে ফার্মটি নির্মাণের পর গত এক বছর এলাকায় অতিরিক্ত হারে মশা ও মাছি বেড়ে গেছে। এছাড়া প্রায় এক বর্গকিলোমিটার জুড়ে মুরগির ফার্মের বর্জের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। এতে প্রায় সময় আশ-পাশের বাসিন্দারা শ্বাসকষ্ট, ডাইরিয়াসহ নানা রোগে ভূগছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়বৃদ্ধরা আক্রান্ত হচ্ছেন বেশি।

বাসিন্দাদের অভিযোগ অস্বীকার করে এ.এম মুরগির খামারের স্বত্বাধিকারী মো. আল-মামুন। তিনি সেলফোনে এ প্রতিবেদককে বলেন, খামার দুটির মধ্যে একটি তার, অপরটি তার বোন জামাতাসহ দুইজনের। খামারের অনুমতির বিষয়ে তিনি বলেন, তার জানা মতে খামার গড়তে তেমন কোনো দপ্তরের অনুমতি লাগে না। তবে তিনি কৃষি বিভাগ থেকে একটা অনুমতি নিয়েছেন। বিভিন্ন স্থানে তার কয়েকটি খামার রয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, পরিবেশ বা প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তরের কোনো অনুমতি লাগে না। জায়গা দখলের বিষয়ে তিনি বলেন, ওইসব জায়গা তিনি এক ব্যক্তির কাছ থেকে ক্রয় করে নিয়েছেন।

অপরিকল্পিত খামারে কি ধরণের সমস্যা হতে পারে এ বিষয়ে পরিবেশবিদ, ডাক্তার ও বিশেষজ্ঞরা জানান, নিয়ম-কানুন না মেনে মুরগির খামার গড়ে তোলা হলে এর নেতিবাচক প্রভাব বাসিন্দাদের উপর পড়বে। বর্জের দুর্গন্ধে হাফানি ও শ্বাসকষ্টজনিত নানা রোগ দেখা দেবে। তাছাড়া মশা-মাছিরর মাধ্যমেও রোগ ছড়িয়ে পড়বে। বর্জযুক্ত পানি পেটে গেলে ডাইরিয়া ও ডাইরিয়া জনিত রোগ, শরীরের উপরি অংশে লাগলে চর্মরোগ ও নানা ধরণের এলার্জিজনিত রোগ দেখা দিতে পারে। ডাইরিয়া ও শ্বাসকষ্টে মানুষের মৃত্যু হওয়ারও আশংকা থাকে।

জানতে চাইলে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্যকর্মকর্তা(ভারপ্রাপ্ত) ডা: মো: সেলিম বলেন, বর্জের দুর্গন্ধে হাফানিসহ শ্বাসকষ্টজনিত নানা রোগ দেখা দিতে পারে। আশপাশের বাসিন্দাদের যদি কারো হাফানি থাকে তাহলে ওই দুর্গন্ধের কারণে হাফানিরোগ আরো মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। এছাড়া বর্জের পানি যদি খাওয়ার পানি বা অন্য কোনো খাদ্যের সঙ্গে মিশ্রিত হয় তাহলে ডাইরিয়া এবং শরীরে লাগলে চর্ম রোগ হবে।

একাধিক সূত্র জানায়, একটি খামার গড়ে তুলতে হলে পরিবেশ অধিদপ্তর, প্রাণি সম্পদসহ সরকারের একাধিক দপ্তরের অনুমোদন নেয়ার কথা। কিন্তু আল-মামুন মুরগির খামারটির সরকারি কোনো দপ্তরেরই অনুমোদন নেননি। শুধু গাংচিলের আদর্শগ্রামে নয়, পুরো চর এলাহী ইউনিয়ন জুড়ে অপরিকল্পিতভাবে অসংখ্য মুরগির খামার গড়ে ওঠেছে। প্রাণি সম্পদক কর্মকর্তাদের এ নিয়ে কোনো মাথা ব্যাথ্যা নেই। নেই উপজেলা প্রশাসনের তদারকি। আল-মামুনের বর্জের দুর্গন্ধসহ নানা সমস্যা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনে দ্বারস্ত হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ।

নোয়াখালী পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালকের দায়িত্বে থাকা সিনিয়র ক্যামিস্ট মিজানুর রহমান জানান, ঘন বসতিতে কখনওই এমন মুরগির খামার করার সুযোগ নেই। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, আল-মামুন নামে কোনো মুরগির খামার পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি নেয়নি। খামারের সরেজমিন পরিদর্শনে বিস্তারিত উঠিয়ে ধরলে এ কর্মকর্তা বলেন, বর্জে এক ধরণের বিষক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এটা পরিশোধন না করলে বাসিন্দারা জটিল রোগে ভূগতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, শ্বাসকষ্ট, চর্ম ও মানসিক অসস্তি। দেখা যায়, দুর্গন্ধজনিত কারণে বাসিন্দারের বেশিরভাগই মানসিক রোগে ভুগেন।

দৃষ্টি আকর্ষণ পূর্বক আল-মামুন খামারের বিস্তারিত তুলে ধরলে জেলা প্রাণি সম্পদক কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান উপজেলা প্রাণি সম্পদক কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে সরেজমিন পরিদর্শন পূর্বক প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান। তিনি বলেন, খামারির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো বিধান তাঁদের নেই। ভুক্তভোগী ব্যক্তি বা গোষ্টিকে প্রতিকার চেয়ে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষন করে লিখিত অভিযোগ দেয়ার বা অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করার পরামর্শ দেন তিনি। তার মতে ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন প্রাণি সম্পদক অধিদপ্তরকে সরেজমিন প্রতিবেদন দিতে বললে তারা প্রতিবেদন দিতে পারেন মাত্র।

এ বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জামিরুল ইসলাম বলেন, ইতোমধ্যে খামার দুটির বিষয়ে তিনি অবগত হওয়ার পরই তিনি উপজেলা প্রণী সম্পদ কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীকে সরেজমিন তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।

Previous
Next