Designed by shamsuddin noman

Skip to Content

বিশ্বজিত হত্যা: পলাতক খুনিরা সাজা পাবে কি?

বিশ্বজিত হত্যা: পলাতক খুনিরা সাজা পাবে কি?

Closed

বিশেষ প্রতিবেদক,

বহুল আলোচিত নিরীহ দর্জি বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলায় মৃতুদণ্ডে দণ্ডিত আট ছাত্রলীগকর্মী এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ১৩ ছাত্রলীগ কর্মী আজ অবধি ধরা পরেনি। ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের সামনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের চাপাতির কোপে নির্মমভাবে খুন হয়েছিলেন বিশ্বজিৎ।২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪ এর বিচারক এবিএম নিজামুল হক দুপুর সাড়ে ১২টায় এ রায় ঘোষণা করেন। কিন্তু পলাতক আসামিদের প্রেফতারে কোনো প্রতিবেদন নেই ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪ এর কাছে।বর্বরোচিত এ হত্যাকাণ্ডের এক বছর আটদিন পর রায় ঘোষণা হলেও ধরা পড়েনি পলাতক খুনিরা। এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে হত্যাকাণ্ডের চার বছর।মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আট আসামি হলেন- ছাত্রলীগকর্মী রফিকুল ইসলাম শাকিল, মাহফুজুর রহমান নাহিদ, এমদাদুল হক এমদাদ, জিএম রাশেদুজ্জামান শাওন, সাইফুল ইসলাম সাইফুল, কাউয়ুম মিয়া টিপু, রাজন তালুকদার, নূরে আলম লিমন। এর মধ্যে শেষের দুজন পলাতক ।যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- ছাত্রলীগকর্মী, এইচএম কিবরিয়া, গোলাম মোস্তফা, আজিজুল হক, তারিক বিন জোহর তমাল, আলাউদ্দিন, ওবায়দুর কাদের তাহসিন, ইমরান হোসেন ইমরান, আজিজুর রহমান আজিজ, আল-আমিন শেখ, রফিকুল ইসলাম, মনিরুল হক পাভেল, কামরুল হাসান ও মোশারফ হোসেন। প্রথম দু’জন ছাড়া বাকিরা পলাতক রয়েছেন। একই সঙ্গে যাবজ্জীবন সাজা পাওয়া আসামিদের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে জরিমানার আদেশ দিয়েছেন আদালত।বিশেষভাবে উল্লেখ্য, এ মামলার রায় প্রদানের পর মামলার রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনাকারী বিশেষ পিপি মো. রফিকুল ইসলাম চাকরিচ্যুত হয়েছেন।মামলার বিচারক এবিএম নিজামুল হক রায়ে বলেন, বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডটি অন্য ১০টি হত্যাকাণ্ডের মতো নয়। এ হত্যাকাণ্ডটি বিভিন্ন দিক থেকে ব্যতিক্রম ও স্পর্শকাতর। কারণ এ হত্যাকাণ্ডটি রাতের অন্ধকারে বা গোপনে করা হয়নি। বরং প্রকাশ্য দিবালোকে আসামিরা ছুরি, চাপাতি, লোহার রড ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে বিশ্বজিতকে আঘাত করে হত্যা করেছে। যা মানবতা ও নৈতিকতার কোনো স্তরেই পড়ে না। নিরাপরাধ মানুষের প্রানহাণি ও অহেতুক হত্যা সমর্থনযোগ্য নয়।বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের ধারণ করা দৃশ্যটি দেশের ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রচারিত হয়েছে। যা দেখে হতবাক ও আতঙ্কিত হয়েছেন সাধারণ মানুষ। ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, বিশ্বজিৎকে নির্মমভাবে মারধর করে রক্তাক্ত করে আসামিরা।এ হত্যাকাণ্ডে অপরাধ ও নিষ্ঠুরতা এমন পর্যায়ের ছিল, যা বহির্বিশ্বের কাছে দেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুন্ন হয়েছে এবং অপরাধীদের এমন আচারণে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে বহির্বিশ্বসহ দেশের সকল মানুষের কাছে ভুল বার্তা দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছিল।বিচারক তার রায়ে আরও বলেন, সামগ্রিকভাবে অপরাধের মাত্রা ও গুরুত্ব বিবেচনা করে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করলে ন্যায় বিচার হবে বলে মনে করেন ট্রাইব্যুনালের বিচারক। এছাড়া এ মামলার সাক্ষী বিশ্বজিতের বাবা অনন্ত চন্দ্র দাসের সাক্ষ্য দেওয়ার সময় ছেলের শোকে কাতর হয়ে আহাজারি করেন। তিনিও ন্যায় বিচারের প্রত্যাশা করেছেন।বিচারক রায়ে বলেন, নথি পর্যালোচনা করে এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ১৪৩ ধারায় যে অভিযোগ আনা হয়েছে, রাষ্ট্রপক্ষ তা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। কেননা ঘটনার দিন আসামিরা সকলে একত্রে অবরোধর বিরোধীর শোভাযাত্রা নিয়ে ঘটনাস্থলে এসেছিল এবং আসামিদের উক্ত শোভাযাত্রার অধিকার মৌলিক ও আইন সম্মত ছিল।শোভাযাত্রায় মিলিত হওয়া আইন সম্মত হলেও পরবর্তীকালে উক্ত শোভাযাত্রা বেআইনি হতে পারে। কেননা শান্তিপূর্ণ শোভা যাত্রায় কোনও সদস্য যদি অপর কোনও সদস্যকে আক্রমণ করে অপরপক্ষের কোনো সদস্য যদি পালানোর সময় আক্রমণ করে, সেটা বেআইনি বলে প্রমানিত হবে।বিচারক আরও বলেন, এ মামলার সাক্ষ্য প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনা করে, রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪/১৪৩ ধারায় অভিযোগ প্রমাণ করতে পেরেছেন। তাই এ হত্যাকাণ্ডটি নিষ্ঠুর, মর্মান্তিক ও বর্বরোচিত বিধায় কিছু আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া আবশ্যক।২০১৩ সালের ২৪ অক্টোবর প্রধান তদন্তকারীর ডিবি পুলিশের ইন্সপেক্টর তাজুল ইসলামের জেরা শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ্যের স্বাক্ষ্য সমাপ্ত হয়।মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ্যের মোট ৬০ জন সাক্ষীর মধ্যে ঘটনার সময় আহত দু’আইনজীবীসহ ৩২ জনের স্বাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। আদালতে দেওয়া সাক্ষীদের মধ্যে একজন সাক্ষীকে বৈরী ঘোষণা করা হয়েছে। হাজতে থাকা আসামি নাহিদ নিজে এবং তার পক্ষে তার ভগ্নীপতি মো.রুহুল আমিন সাফাই সাক্ষী দিয়েছেন।গত ২০১৩ সালের ২ জুন মহানগর দায়রা জজ মো. জহুরুল হকের আদালত ২১ জনের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন। মামলায় ২১ আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে পুলিশ। এদের মধ্যে ৮ জন কারাগারে ও ১৩ জন পলাতক রয়েছেন।মামলার চার্জশিটভুক্ত ২১ আসামি হলেন- রফিকুল ইসলাম শাকিল (চাপাতি শাকিল), মাহফুজুর রহমান নাহিদ, এমদাদুল হক এমদাদ, জিএম রাশেদুজ্জামান শাওন, এইচ এম কিবরিয়া, কাইউম মিয়া টিপু, সাইফুল ইসলাম, রাজন তালুকদার, খন্দকার মো. ইউনুস আলী, তারিক বিন জোহর তমাল, গোলাম মোস্তফা, আলাউদ্দিন, ওবায়দুর কাদের তাহসিন, ইমরান হোসেন ইমরান, আজিজুর রহমান আজিজ, মীর মো. নূরে আলম লিমন, আল-আমিন শেখ, রফিকুল ইসলাম, মনিরুল হক পাভেল, কামরুল হাসান ও মোশারফ হোসেন। এরা সবাই ছাত্রলীগ কর্মী।গত ২০১৩ সালের ৫ মার্চ মামলাটিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ ছাত্রকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ডিবি। পরে গত ২ এপ্রিল উক্ত চার্জশিট গ্রহণ করেন আদালত। আসামিদের মধ্যে সাতজন জেলে আটক রয়েছেন। চারজনকে চার্জশিট থেকে আব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। গ্রপ্তার হওয়া সাতজনের মধ্যে চারজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ৬০ জনকে এ মামলার সাক্ষী করা হয়েছে। বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের দু’মাস ২৪ দিন পর আদালতে এ চার্জশিট দেওয়া হয়। গত ২০১২ সালের ২৩ ডিসেম্বর হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আসামি শাকিল, শাওন, এমদাদ ও নাহিদ ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন।উল্লেখ্য, গত ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর সকালে নৃশংসভাবে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয় পুরান ঢাকার দর্জি বিশ্বজিৎ দাসকে । ওইদিন বিরোধীদলের ডাকা অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে পুরান ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছে ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। তখন অবরোধ প্রতিরোধে মাঠে নামা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা বিরোধীদলীয় কর্মীদের ধাওয়া করেন। এ সময় আতঙ্কিত হযে পথচারী বিশ্বজিৎ দৌড়ে পার্কের উত্তর পাশের একটি ডেন্টাল ক্লিনিকে (দোতলায়) আশ্রয় নেন। এর পরই ছাত্রলীগের কর্মীরা দোতলায় উঠে বিশ্বজিকে ধরে চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপায় এবং রড-লাঠি দিয়ে মারধর করেন। সেখান থেকে মারতে মারতে নিচে নামিয়ে আবার তার ওপর চালানো হয় বর্বর নির্যাতন। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদপত্রের কর্মীরা ছাত্রলীগের হামলার এ দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করেন। যা পরে গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়। বিশ্বজিৎ দাসের গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ভোজেশ্বর মশুরা গ্রামে।

Previous
Next