Designed by shamsuddin noman

Skip to Content

ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্ধকারে বিএনপি

ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্ধকারে বিএনপি

Closed

1445396963-300x200

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে চাইলে এক বাক্যে দলটির নেতাকর্মীদের জবাব হতো ‘আন্দোলন’। অর্থাৎ নির্বাচন হতে দেবেন না এমনই দৃঢ় মনোভাব ছিল তাদের। ওই আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পর প্রায় এক বছর হতাশা থাকলেও ৫ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে আবারও সক্রিয় হয় বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট। দেশজুড়ে তারা লাগাতার অবরোধের ডাক দিয়ে জ্বালাও পোড়াওসহ সহিংস আন্দোলন করে । কিন্তু তিন মাসের ওই আন্দোলনও ব্যর্থ হয়। ফলে দ্বিতীয় দফা এই ব্যর্থতার পর দলটির ‘ভবিষ্যৎ’ কী এ আলোচনা ও প্রশ্ন এখন বাইরের চেয়ে বিএনপির ভেতরেই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

বলা হচ্ছে, দলের ভবিষ্যৎ কর্ম-পরিকল্পনা নিয়ে ছেলে তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা করতে লন্ডন গেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। কিন্তু ওই আলোচনার সূত্র ধরে কোন পথে হাঁটবে বিএনপি? দলটি কি আবারও সরকারবিরোধী আন্দোলনে যাবে, নাকি কেবল বিদেশিদের মধ্যস্থতার আশায় দিন পার করবে- এ ধরনের নানা প্রশ্ন সচেতন মহলের পাশাপাশি বিএনপির মধ্যেও ঘুরপাক খাচ্ছে।

এদিকে এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে যুক্ত হয়েছে দলটির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা। যাদের বিরুদ্ধে মামলা নেই তাদেরও রাখা হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারিতে। খোদ চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ প্রথমসারির অনেকে নেতারই বিভিন্ন মামলায় সাজা হতে পারে বলে বিএনপির পাশাপাশি বাইরেও আলোচনা হচ্ছে। সর্বশেষ দুই বিদেশি হত্যায়ও জড়িয়েছে বিএনপি নেতাদের নাম। ফলে আরেক দফা চাপের মুখে পড়েছে দলটি। এ অবস্থায় লন্ডন থেকে ফিরলেও দলের জন্য খালেদা জিয়া কী করতে পারবেন তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দলীয় কার্যক্রম থেকে নিজেদের ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিচ্ছেন নেতাকর্মীরা। এমনকি গ্রেফতার-আতঙ্কে গুলশান কার্যালয়ের কর্মকর্তারা পর্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতাদের মধ্যে কিছুদিন আগেও বেশ সক্রিয় ছিলেন ড. আবদুল মঈন খান। সম্প্রতি প্রেসক্লাবে জঙ্গিবাদ ইস্যুতে এক বক্তৃতা দিয়ে তিনি বিপাকে পড়েছেন। তিনি বলেছিলেন, জঙ্গিবাদের জুজুর ভয় দেখিয়ে সরকার আজ নিজেই তার ফাঁদে পড়েছে। তার এ বক্তৃতায় স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, বিএনপির ওই নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই বিদেশি হত্যার রহস্য বের হতে পারে। এ ঘটনার পর চুপচাপ হয়ে গেছেন ড. মঈন। এখন আর তার কোনও তৎপরতা নেই। এদিকে আরেক সদস্য মির্জা আব্বাস গত কয়েকমাস ধরেই আত্মগোপনে। দলে অত্যন্ত সক্রিয় নেতা সাদেক হোসেন খোকা গত প্রায় এক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে। সম্প্রতি একটি মামলায় তার সাজা হয়েছে। সক্রিয় আরেক নেতা আবদুল্লাহ আল মিন্টু লন্ডনের পর এখন ব্যাংককে। ড. ওসমান ফারুক তিনমাস পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে চুপচাপ বাসায় বসে আছেন। বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ে তৎপর আরেক নেতা কেন্দ্রীয় ভাইস-চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী দলের সঙ্গে অভিমান করে বাসায় বসে আছেন। তার অভিযোগ হলো গ্রেফতার করে জেলখানায় নেওয়া হলেও দলের কেউ তার খোঁজ নেননি। মহানগরীর প্রভাবশালী দুই নেতা হাবিব-উন  নবী খান সোহেল ও আবদুল কাইয়ুমের নামও বিদেশি হত্যাসহ নাশকতার মামলাগুলোর সঙ্গে জড়িয়েছে। ফলে তারা আত্মগোপনে চলে গেছেন। এসবের বাইরে অসুস্থতা, বয়সের ভার এবং মামলার কারণে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন দলের বড় একটি অংশ।

আলোচনা করে দলটির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য, ভাইস-চেয়ারম্যান, উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য এবং যুগ্মমহাসচিবসহ অনেকের কাছেই দলের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে চেয়ে কোনও সদুত্তর পাওয়া যায়নি। কারণ নিজ দলের বিষয়ে নেতিবাচক জবাব দিতে তারা রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের বেশিরভাগই নিজেদের হতাশার কথা জানিয়েছেন। বলছেন, সবকিছুই তাদের অন্ধকার মনে হয়। কারণ দলের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনও দিকনির্দেশনা তাদের সামনে নেই। তারা জানেনও না এরপর কী উপায়ে বিএনপি এগুবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমানের মতে, বিএনপির ভবিষ্যৎ নিয়ে দু’রকম ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রথমটি হলো- এখন হয়তো দুঃসময় চলছে। ঘুরে দাঁড়াতে কষ্ট হবে। দ্বিতীয়টি হলো- অদূর ভবিষ্যতে বা ‘লংটার্মে’ বিএনপির উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ- সরকারের জনপ্রিয়তা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। ফলে শাসনক্ষমতা কতদূর তারা টেনে নিয়ে যেতে পারবে সে ব্যাপারে বিএনপি কেন, সবারই সংশয় রয়েছে।

দলের ভবিষ্যৎ কর্মকৌশল বা পরিকল্পনার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি অন্ধকারে, কিছুটা বিভ্রান্তও। কারণ, এরপর কী হবে তা আমার জানা নেই।

কেন্দ্রীয় ভাইস-চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, বিএনপির যে বিপর্যয়ের কথা বলা হচ্ছে তা সাময়িক; সময়ে তা কেটে যাবে। তার মতে, একটি বিষয় লক্ষণীয়, বিএনপির অবস্থা খারাপ বলে মনে হয়। কিন্তু সরকার তো স্বস্তিতে নেই। তার অর্থ হলো সরকার একদলীয় নির্বাচন করেও সঠিক পথে চলতে পারছে না।

দলের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চেয়ারপারসন লন্ডন থেকে ফিরলে নতুন পলিসি ঠিক করা হবে। তবে মামলা-মোকাদ্দমা ও পুলিশের হয়রানির কারণে নেতাকর্মীরা কিছুটা হতাশায় রয়েছেন বলে স্বীকার করেন নোমান।

উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর মতে, বিএনপির প্রতিপক্ষ স্বৈরাচারী বলেই সাময়িকভাবে হয়তো কিছুটা বেকায়দায় পড়েছি বলে অনেকে মনে করতে পারেন। বিশ্বের যেকোনও দেশে এই ধরনের স্বৈরাচার ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে বসে থাকলে সেখানে গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়ে এবং প্রতিপক্ষের ওপর একই কায়দায় জুলুম-নির্যাতন চালায়। কিন্তু এই সংকট থেকে উত্তরণ ঘটানোই হচ্ছে রাজনীতি। বিএনপি রাজনীতি করছে এবং একদিন সফল হবে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলোর মতে, আন্দোলনে দু’দফা ব্যর্থতার পর বিএনপির ধারণা হয়েছিল ভারতসহ বিদেশিরা হয়তো চাপ সৃষ্টি করে সব দলের অংশগ্রহণে মধ্যবর্তী একটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে। আর এর জন্য তারা দেশের ভেতরে ও বাইরে তৎপরতাও চালিয়েছেন। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে; ওই আশাও দলটির মধ্যে ক্ষীণ হয়ে আসছে। সরকার যেভাবে কঠোর অবস্থান নিয়েছে তাতে শুধু বিদেশিরা কিছু করতে পারবে বলে বিএনপির অনেকেই এখন আর মনে করতে পারছেন না। ফলে তাদের হতাশার মাত্রা আরও বাড়ছে। চোখে তারা অন্ধকার দেখছেন।

Previous
Next