Designed by shamsuddin noman

Skip to Content

৮৪ বছরের মুক্তিযোদ্ধা সুন্দর আলী, রিকশা চালান ৩৬ বছর

৮৪ বছরের মুক্তিযোদ্ধা সুন্দর আলী, রিকশা চালান ৩৬ বছর

Closed
by September 16, 2017 জাতীয়

দেশ পাক হানাদারমুক্ত শেষে ৪৪ বছরের ‘ঢাকাবাসিন্দা’ জীবনে গোপালগঞ্জ কোটালিপাড়ার সন্তান ৮৪ বছর বয়স্ক মো. সুন্দর আলী শেখ রিকশা চালিয়ে জীবন-যাপনের আর্থিক যোগান দিচ্ছেন ৩৬ বছর ধরে।
পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে স্ত্রী হারা, উপার্জনক্ষম সন্তান-গ্রামে ভিটেমাটি হারা ঢাকার রায়েরবাজারের একটি গ্যারেজ থেকে ভাড়া চালিত রিকশা চালাতে বাধ্য হচ্ছেন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়া সত্বেও।
তার রিকশার সম্মুখে টিনের খণ্ডিত অংশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি অঙ্কন করা। এরপাশে তার একটি পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি লাগানো। এটি নষ্ট হয়ে গেছে।
সুন্দর আলী কোটালিপাড়ার হরিণাহাটি গ্রামের মৃত ওফাজ উদ্দিন শেখ ও মাজু বিবি দম্পত্তির তৃতীয় সন্তান। সে গ্রামের আলমগীর মেম্বারের গোষ্ঠীগত চাচা হন তিনি। ৫ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছাড়া সবাই পৃথিবী ত্যাগ করেছেন। বড় ভাই জোবেদ আলী শেখ ও মেজোভাই নজর আলী শেখের মৃত্যু হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময়, পাকসেনাদের গুলিতে বলে সুন্দর আলীর ভাষ্য।
এরপরই সুন্দর আলী মুক্তিযুদ্ধে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। তিনি জানান, প্রথমদিকে তিনি নিজ গ্রামে বিভিন্ন বাড়ির উঠানে পাকা সবরি কলা, কচি ডাব ঝুলিয়ে রাখতেন নাগালের মধ্যে। এসবে তিনি ইনজেকশন সিরিঞ্জের মাধ্যমে বিষ মিশিয়ে দিতেন। এসব পাকহানাদাররা খেয়ে মারা পড়তো। এর কিছুদিনের মধ্যে তিনি তারই গ্রামের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা হেমায়েতের দলে যোগদান করে তার বাড়ির খুব কাছেই বরিশাল চলে যান। সেখানে রামশীল, কোদালধোয়া নামকস্থানে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন বাবুর্চি বেশে। দলের জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে, গাছে গাছে চড়ে ফলমূল, তরকারি, চাল-ডাল সংগ্রহ করে রান্না করতেন। এর প্রায় ৫ মাসের মধ্যেই স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাদ গ্রহণ করেন সুন্দর আলী।
তিনি জানান, এরপর গ্রামে প্রচণ্ড অভাব দেখা দেয়। এসময় গ্রামেরই একজনের পরামর্শে চলে আসেন ঢাকায়। প্রথমদিকে কুলিমজুর ছিলেন। ঢাকায় আসার ১০ বছর পর জানতে পারেন মুক্তিযুদ্ধের তালিকা হয়েছে, যার মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন অনেকেই। এটা শুনে বাড়ি যান এবং জানতে পারেন, তার গ্রাম থেকে যে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে, তাতে তার নাম নেই। এরপর গ্রামের নানান জনের কাছে নাম তালিকাভুক্ত করতে গিয়েও ইতিবাচক সাড়া পাননি। আবার ঢাকায় এসে শুরু করেন কঠোর পরিশ্রমী জীবন-যাপন।
হৃদরোগের ছোবলে ৩৬ বছরের জীবন সঙ্গিনী মরিয়মের মৃত্যু হয় প্রায় ২ বছর আগে। তাদের তিন সন্তানের মধ্যে বড় সন্তান ফজলুল হক শেখ (৪৭) এক সময় দিনমজুরি করতেন। প্রায় সাত বছর আগে একজনের বাড়িতে পয়নিষ্কাশনের কাজ করতে গিয়ে বিষাক্ত গ্যাসের ট্যাংক বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হয়ে কর্মক্ষমতা হারান এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক ফজলুল। তার স্ত্রী খাদিজা প্রায় দুই বছর আগে মরণব্যাধি ক্যান্সারের সঙ্গে পরাজিত হন। ফজলুলও ঢাকার রায়ের বাজারে একটি ভাড়া বাসায় থাকেন বড় ছেলে রাকিব (২৬) এর সংসারে। মেয়ে শম্পাও থাকেন রাকিবের সঙ্গে। ফজলুল সহযোগিতা কুড়িয়ে বেড়ান এখানে-ওখানে।
দুই মেয়ে নূরজাহান (৪২) ও রহিমুন (৩৬)কে বিয়ে হয়েছে বরিশালে। নূরজাহান স্বামী-সন্তানসহ ঢাকা উত্তরায় পিঠা বিক্রি করে জীবন ধারণ করছেন।
পৈত্রিক সূত্রে গ্রামে ২ শতক জমির সাবেক মালিক সুন্দর আলী জানান, খাজনা না দিতে পারায় সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে সেই জমি।
আপনি মুক্তিযোদ্ধা- এর সাক্ষী কেউ আছে কি-না– প্রশ্নের উত্তরে সুন্দর আলী জানান, দলনেতা হেমায়েত তো মারা গেছেন। এখন জীবিত আছেন, তার দলেরই আরেক সদস্য মুক্তিযোদ্ধা হাসেন সরনামা। হাসেনের কাছে গেলেই সত্যতা মিলবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সুন্দর আলীর পরিচয়।
প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত রিকশা চালিয়ে দেড় থেকে দুইশত টাকা ঢোকে সুন্দর আলীর পকেটে। এ থেকেই খাওয়া-দাওয়া-রিকশার ভাড়া দিন প্রতি ৭০টাকা দিতে হচ্ছে।
সুন্দর আলী বলেন, এমনে রিকশা ভাড়া ১২০ টেকা, কিন্তু রিকশার মালিক ঈমান আলী আমার কাছ থেইকা নেয় ৭০ টেকা। উনি আমারে সাহায্য করে এমনে। রিকশা নষ্ট হইলে তাড়াতাড়ি ঠিক কইরা দেয়। ৩৬ বছরের রিকশা চালক জীবনে ঈমান আলীর গ্যারেজ তার দ্বিতীয় রিকশা গ্যারেজ বলে জানান সুন্দর আলী।
দৃষ্টি শক্তিতে সমস্যাগ্রস্থ সুন্দর আলী বেশকিছুদিন আগে চোখের ডাক্তার দেখিয়ে ছিলেন, কিন্তু আর্থিক অসামর্থের কারণে ১২০০ টাকা মূল্যের চশমা তিনি ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হয়েছেন।
তিনি রায়ের বাজার যেখানে থাকেন, সেখানের মালিক ঘর ভাড়া নেন না। প্রতিদিন সকালে পান্তাভাত খেয়ে বের হন বাসা থেকে। দুপুরে ও রাতে বাইরে থেকে কখনও কিনে বা কারও আর্থিক সহযোগিতায় খাদ্য জোটে তার ভাগ্যে। দুপুর ১টা পর্যন্ত রিকশা চালিয়ে বাসায় চলে যান, নাওয়া-খাওয়া-নামাজ ও বিশ্রামের উদ্দেশে।
দুটো পুরান শার্ট-লুঙ্গি-দুটো পুরান গামছা ও এক জোড়া প্লাস্টিকের স্যান্ডেলই নিয়মিত পাঁচওয়াক্ত নামাজ আদায়কারী সুন্দর আলীর বস্ত্রাদি। রাতে ঘুমান, পাতলা কাঁথায় ফ্লোরিং করে। সুন্দর আলী তার সম্পর্কে যখন বলছিলেন, তখন অঝোর ধারায় কান্না করছিলেন। এই কান্নারত অবস্থাতেই তিনি বলেন, বহুত চেষ্টা করছি শেখের বেটির লগে দেখা করণের (বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা)। সারাদিন তো ধানমণ্ডিতেই থাকি। উনি যখন ৩২ এ আসে, তখন ঢোকার চেষ্টা করছি, পারি নাই। একটা বার যদি উনার সাথে দেখা করতে পারতাম….
তার চাওয়া একটিই- আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে জীবন-যাপন করা।

Previous
Next