অর্থনীতি

গ্রামীণফোনের শেয়ারহোল্ডাররা হারালেন সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা

শেয়ারের অব্যাহত দরপতনে গ্রামীণফোনের শেয়ারহোল্ডাররা পাঁচ মাসে হারিয়েছেন প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা ও পরিচালকরা হারিয়েছেন ১৩ হাজার কোটি টাকা। প্রাতিষ্ঠানিক, সাধারণ ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা হারিয়েছেন প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা।

টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) গ্রামীণফোনের কাছে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা পাওনা দাবি করার পর থেকেই শেয়ারবাজারে কোম্পানিটির শেয়ার দাম কমতে থাকে। দিন যত যাচ্ছে দেশের শেয়ারবাজারের সব থেকে বড় মূলধনী কোম্পানিটির শেয়ার দাম তত কমছে।

গ্রামীণফোনের শেয়ারের এমন করুণ দশার কারণে সার্বিক শেয়ারবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কয়েক মাস ধরে অব্যাহত পতনের মধ্যে রয়েছে শেয়ারবাজার। এতে প্রায় প্রতিদিনই লেনদেনে অংশ নেয়া বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। ফলে প্রতিনিয়ত পুঁজি হারাচ্ছেন লাখ লাখ বিনিয়োগকারী।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমনের মতে, বর্তমানে শেয়ারবাজারে সবচেয়ে আতঙ্কের খবর গ্রামীণফোনের কাছে বিটিআরসির পাওনা টাকা দাবি করা। গ্রামীণফোন শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি। বিটিআরসি থেকে কোম্পানিটির কাছে আকস্মিক ও বিলম্বিত পাওনা দাবির ফলে শেয়ারটির পতন হচ্ছে, যা ওই কোম্পানির বিনিয়োগকারীসহ সার্বিক শেয়ারবাজারকে ক্ষতির মুখে ফেলেছে।

বিটিআরসি গত ২ এপ্রিল গ্রামীণফোনের কাছে ১২ হাজার ৫৭৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা পাওনা দাবি করে চিঠি দেয়। এর মধ্যে বিটিআরসির পাওনা আট হাজার ৪৯৪ কোটি এক লাখ টাকা ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পাওনা চার হাজার ৮৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।

বিটিআরসির পাওনার মধ্যে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সুদের পরিমাণ রয়েছে ছয় হাজার ১৯৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এসব পাওনার জন্য গ্রামীণফোনকে প্রথমবারের চিঠিতে ১০ কার্যদিবস সময় বেঁধে দেয় বিটিআরসি। রিপ্লেসমেন্ট সিমের জন্য ট্যাক্স, টু-জি লাইসেন্স নবায়ন ফি ও ইন্টারেস্ট বাবদ এই টাকা দাবি করে তারা, যা মূল্যায়ন করেছে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল।

বিটিআরসি থেকে পাওনা টাকা দাবি করে যেদিন গ্রামীণফোনকে চিঠি দেয়া হয় তার আগের কার্যদিবসে অর্থাৎ ১ এপ্রিল কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ৪১৭ টাকা। বিটিআরসি থেকে পাওনা দাবি করার দিন থেকেই গ্রামীণফোনের শেয়ার দাম কমতে থাকে। অব্যাহত দরপতনের কারণে রোববার (১ সেপ্টেম্বর) লেনদেন শেষে কোম্পানিটির শেয়ার দাম দাঁড়িয়েছে ৩১০ টাকায়।

এ হিসাবে প্রতিটি শেয়ারের দাম কমেছে ১০৭ টাকা। গ্রামীণফোনের মোট শেয়ার সংখ্যা ১৩৫ কোটি তিন লাখ ২২টি। অর্থাৎ অব্যাহত দরপতনে গ্রামীণফোনের শেয়ার দাম সম্মিলিতভাবে কমেছে ১৪ হাজার ৪৪৮ কোটি ২১ লাখ দুই হাজার ৩৫৪ টাকা।

কোম্পানিটির মোট শেয়ারের ৯০ শতাংশ রয়েছে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে। এ হিসাবে দরপতনের কবলে পড়ে কোম্পানিটির উদ্যোক্তা ও পরিচালকরা হারিয়েছেন ১৩ হাজার তিন কোটি ৩৮ লাখ ৯২ হাজার টাকা।

প্রতিষ্ঠানটির বাকি শেয়ারের মধ্যে ২ দশমিক ১৪ শতাংশ রয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং বিদেশিদের কাছে ৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

এ হিসাবে গত পাঁচ মাসে গ্রামীণফোনের শেয়ারে বিনিয়োগ করে বিদেশিরা হারিয়েছেন ৫৬৯ কোটি ২৫ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা হারিয়েছেন ৫৬৬ কোটি ৩৬ লাখ ৯৮ হাজার টাকা। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা হারিয়েছেন ৩০৯ কোটি ১৯ লাখ ১৭ হাজার টাকা।

পাওনা দাবি করে গত ২ এপ্রিল বিটিআরসি থেকে গ্রামীণফোনকে চিঠি দেয়া হলেও এখনও তা আদায় হয়নি। গ্রামীণফোনের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে না পেরে এখন প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। বর্তমানে গ্রামীণফোনের এনওসি (সেবার অনুমোদন ও অনাপত্তিপত্র) দেয়া বন্ধ রয়েছে।

এদিকে কোম্পানিটির লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। এ বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, গ্রামীণফোনের লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না, তা জানতে চেয়ে এরই মধ্যে নোটিশ পাঠাতে বিটিআরসিকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

বিটিআরসি থেকে পাওনা দাবি করার পর ১৬ এপ্রিল চিঠি দিয়ে পাওনার দাবি অস্বীকার করে গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ। এতে বিটিআরসির দাবিকে প্রত্যাহার করে নিতে বলা হয়। একই সঙ্গে সুন্দর সমাধানের জন্য আলোচনায় বসার আহ্বান করা হয়।

এরপর বিটিআরসি ১২ মে গ্রামীণফোনকে চিঠি দিয়ে অবিলম্বে পুরো টাকা পরিশোধের জন্য নির্দেশ দেয়। তবে গ্রামীণফোন দাবি পরিশোধ না করায় ২০ জুন চিঠি দিয়ে পুরো টাকা ১০ কার্যদিবসের মধ্যে পরিশোধ করতে বলে বিটিআরসি।

এর প্রেক্ষিতে ২৩ জুন বিষয়টি সমাধানের জন্য বিটিআরসিকে আইনগত উপায়ে সালিশি নোটিশ দেয় গ্রামীণফোন। তার সাতদিন পর ৩০ জুন বিষয়টি সালিশির মাধ্যমে সমাধানের জন্য টেলিকম সচিবকে চিঠি দেয়। এ পরিস্থিতিতে ৪ জুলাই গ্রামীণফোনের ব্যান্ডথউইথ ৩০ শতাংশ কমানোর জন্য ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারকানেকশন গেটওয়ে (আইআইজি) অপারেটরদের নির্দেশ দেয়।

ব্যান্ডথউইথ কমানোর পরিপ্রেক্ষিতে ৬ জুলাই বিটিআরসিকে বিষয়টি প্রত্যাহার করে নেয়ার জন্য অনুরোধ করে চিঠি দেয় গ্রামীণফোন। একই সঙ্গে সমস্যা সমাধানের জন্য আলোচনায় বসার আহ্বান জানায়। এরপর গ্রাহকের সমস্যার কথা চিন্তা করে ১৩ দিনের মাথায় ব্যান্ডথউইথ কমানোর নির্দেশনা প্রত্যাহার করে নেয় বিটিআরসি। তবে বকেয়া টাকা আদায়ের বিষয়ে অনড় বিটিআরসি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close