নোয়াখালীনোয়াখালীর খবররাজনীতিলক্ষ্মীপুর

সম্মেলনের জন্য উদগ্রীব তৃণমুলের নেতা-কর্মীরা, দীর্ঘ ১৯ বছরেও সম্মেলন হয়নি রায়পুর আওয়ামী লীগের

বিশেষ প্রতিবেদক : লক্ষ্মীপুর জেলা রায়পুর উপজেলায় আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০১ সালে। সে সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন মরহুম তোজাম্মেল হোসেন চৌধুরী দুলাল আর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন ইসমাইল হোসেন খোকন। ২০০১ সালে ৬৭ সদস্যের যে কমিটি গঠন করা হয়েছিল তাদের ২১ জন ইতিমধ্যে মারা গেছেন। অনেকেই বয়সের ভারে নতজানু হয়ে দলীয় কার্যক্রমে নিষ্কিয় রয়েছেন। দলের বিভিন্ন সূত্রে এবং নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বলে জানা গেছে ২০০১ সালের গঠিত কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ৮/১০ জন সক্রিয আছেন। ২০০১ সালে সম্মেলনে দলের সভাপতির দায়িত্বপ্রাপ্ত তোজাম্মেল হোসেন চৌধুরী ২০০৪ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত উপজেলা চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন। দলের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যক্ষ মামুনুর রশিদ যিনি রায়পুর উপজেলা চেয়ারম্যানও বটে। তিনি নোয়াখালী প্রতিদিনকে জানান, তোজাম্মেল সাহেব যখন উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন তখন স্থানীয় সিদ্ধান্তে আমাকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। আবার তিনি উপজেলা চেয়ারম্যানের পদ হারালে পুনরায় সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০১৭ সালের ১৪ মে তোজাম্মেল হোসেন দুলালের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে তিনি গুরুতর অসুস্থ হলে আমাকে পুনরায় ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।
সরজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পৌর আওয়ামী লীগের ৯টি ওয়ার্ড কমিটি গঠন করা হলেও জেলা বা উপজেলা আওয়ামী লীগ গত ৭ বছর যাবত চলে আসা রায়পুর পৌর আওয়ামী লীগের সম্মেলনের তারিখ দিচ্ছে না বলে পৌর আহ্বায়ক মোহাম্মদ বাকি বিল্লাহ এ প্রতিবেদককে জানান। শুধু পৌর আওয়ামী লীগ নয় উপজেলা যুবলীগ ৭ বছর এবং উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগ ৬ বছর যাবত চলছে আহ্বায়ক কমিটির মাধ্যমে। পৌর যুবলীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনসমূহে সম্মেলন না হবার কারণে নিস্ক্রিয় রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রেমতে জানা গেছে, রায়পুর বিএনপি-জামায়াতের দুর্গ। ১৯৯৬ সালে উপনির্বাচনে খালেদা জিয়ার ছেড়ে দেওয়া এ আসনে আঞ্চলিকতার ধুয়া তুলে বিএনপি প্রার্থী বহিরাগত মওদুদ আহমেদকে পরাজিত করে করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা হারুন-অর-রশিদ। ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচন ছাড়া এ আসনে কখনও আওয়ামী লীগের প্রার্থী জয়ী হতে পারেনি। গত সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের সমর্থনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এ প্রতিবেদককে জানান, স্থানীয় আওয়ামী লীগকে একটি বিশেষ মহল কুক্ষিগত করে রাখার কারণে গত ১৯ বছর উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন করা হয়নি। দীর্ঘদিন সম্মেলন না করার কারণে দলের সাংগঠনিক ক্ষমতা দুর্বল হয়েছে। নতুন নেতৃত্ব তৈরি হয়নি। বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি ক্ষমতার সুফল ভোগ করলেও নেতাকর্মীরা বঞ্চিত হচ্ছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের শুরুর দিকে রায়পুরের বর্তমান সংসদ সদস্য উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের ওয়ার্ড পর্যায় থেকে দলকে সংগঠিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কিন্তু কাজী পাপুলের এ উদ্যোগের বিরোধিতা করেন স্থানীয় এবং জেলা আওয়ামী লীগের একটি অংশ। শেষ পর্যন্ত বিরোধীদের বিরোধিতা কাজে লাগেনি। রায়পুরের প্রতিটা ওয়ার্ডভিত্তিক ওঠোন বৈঠকের মাধ্যমে দলের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করতে সফল হন কাজী পাপুল। তিনি প্রতিটা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের অফিস, আসবাবপত্র এবং অফিস ভাড়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। মহিলাদের মাঝে আওয়ামী লীগের সমর্থন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি ইউনিয়নের ৫০ জন মহিলাকে সেলাইর মেশিন দিয়ে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করেছিলেন। প্রতি ইউনিয়নের সাংগঠনিক কর্মতৎপরতা বাড়াতে, যাতে কর্মীদের সাথে দ্রুত যোগাযোগ করতে পারেন তার জন্য প্রতি ইউনিয়নের সভাপতি/সম্পাদককে কাজী পাপুল মোটর সাইকেল কিনে দিয়েছিলেন। ২/১টি জাতীয় কর্মসূচি ছাড়া তেমন কোন কর্মসূচি দেখা যায় না রায়পুরে। জাতিরজনকের মৃত্যুবার্ষিকীতে গরু জবাই কি জিনিস তা রায়পুরবাসী জানত না ২০১৭ সালের পূর্বে। ২০১৭ সাল থেকে কাজী পাপুল জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে রায়পুরের প্রতি ইউনিয়নে ১টি করে গুরু জবাই করে বঙ্গবন্ধুর নামে গরীব-মিসকিনদের খাওয়ানো শুরু করেছেন এবং বর্তমানেও তা অব্যাহত রয়েছে।
দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উপজেলা চেয়ারম্যান, সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র। এ দুজন দুটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকার কারণে দলকে তেমন একটা সময় দিতে পারেন না বলে নেতাকর্মীরা মনে করেন না। সম্মেলনের বিষয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যক্ষ মামুন নোয়াখালী প্রতিদিনকে বলেন, আমি অবশ্যই সম্মেলন চাই। সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি হবে। সাংগঠনিক ভীত মজবুত হবে। একই অভিমত রায়পুর পৌর মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন খোকনের। তিনিও সম্মেলন চান রায়পুরে।
রায়পুরের সংসদ সদস্য কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল সম্মেলন বিষয়ে নোয়াখালী প্রতিদিনকে বলেন, প্রতি ৩ বছর পর পর সম্মেলন হওয়ার কথা থাকলেও রায়পুরে তা মানা হয়নি। আমার এ উপজেলার সম্মেলন ১৯ বছর অনুষ্ঠিত হয়নি। সম্মেলনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে গত ১৯ বছরে ৬টি সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। এতে নেতৃত্বের বিকাশ ঘটতো। নতুন নতুন নেতা নির্বাচনের মাধ্যমে উপজেলায় দলের সাংগঠনিক ক্ষমতা বৃদ্ধি পেত। কাজী পাপুল এমপি দ্রুত সম্মেলনের মাধ্যমে রায়পুরে নতুন প্রজন্মকে কাজে লাগিয়ে নতুন নেতৃত্ব তৈরি করে দলকে শক্তিশালী করতে জেলা এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি অনুরোধ জানান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রায়পুর বিএনপি-জামায়াতের দুর্গ। এ দুর্গ তছনছ করতে হলে কর্মী এবং জনবান্ধব নেতৃত্বের প্রয়োজন। আমি মনে করি, দলের স্বার্থে কেন্দ্রীয় এবং জেলা নেতৃত্ব তা উপলব্ধি করবেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close