নোয়াখালীলক্ষ্মীপুর

পীর-মুরীদ স্টাইলে চলছে লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যক্রম

বিশেষ প্রতিবেদক : লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগ চলছে পীর-মুরীদ স্টাইলে। নেতারা পীর এবং কর্মীরা মুরীদের ভূমিকায় অবতীর্ণ। নেতারা এখন আর কর্মীদের খবর নেয় না। কর্মীরাই ছুটে আসেন নেতাদের কাছে ফুল আর উপটোকন নিয়ে। মাঝখানে কোনো স্তর নেইÑ ওয়ার্ড থেকে সরাসরি জেলা। এ যেন এক রাজকীয় আয়েশ। ওয়ার্ড কমিটির সম্মেলনে অতিথি জেলা নেতৃবৃন্দ, ইউনিয়ন উপজেলা নেতৃবৃন্দ বাদ। এমনই অভিযোগ করেছেন দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা। তাদের অভিযোগ জেলার শীর্ষ নেতারা পদ বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য, তদবীর বাণিজ্যসহ নানবিধ কর্মে ব্যস্ত। বিভিন্ন অযুহাতে নেতাকর্মীদের থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। জেলার শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকের বিরুদ্ধে অযোগ্যতা ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের পদ-পদবী দেওয়া, যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সম্মেলন না করাসহ নানাবিধ অভিযোগের কারণে নেতাকর্মীদের মাঝে হতাশা ও ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছে।
২০১৫ সালের ৩রা মার্চ লক্ষ্মীপুর আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন গোলাম ফারুক পিংকু ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন এ্যাডভোকেট নূর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন। এ দু’নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে নিজেদের আতœীয়-স্বজনকে জেলা উপজেলা ও বিভিন্ন পৌর কমিটির নেতৃত্বে স্থান করে দিয়েছেন। যার কারণে বিএনপির দূর্গ খ্যাত লক্ষ্মীপুরে আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হতে পারছে না। জেলা সভাপতি পিংকুর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে নিজ চাচাতো ভাই সামসুল ওমর শামীমকে জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি, দেলোয়ার হোসেনকে শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক এবং বেলায়েত হোসেনকে কোষাধ্যক্ষ বানিয়েছেন। এই তিনজনসহ আরো অনেককে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত করেছেন। জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী বিনা রহমানকে পদবী লাভ করার পূর্বে লক্ষ্মীপুর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা কখনও দেখেননি এমনকি নামও শুনেননি। পদবী লাভ করার পর সবাই দেখেছে। জেলা সাধারণ সম্পাদক নূর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। তিনি যখন জেলা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তখন সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদটি শূণ্য ঘোষিত হয়। দলের গঠনতন্ত্র মোতাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মনোনীত হবার কথা থাকলেও এক্ষেত্রে দলের গঠনতন্ত্র অনুসরণ করা হয়নি। উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরি কমিটির সদস্য বিজন বাবুকে সভাপতি মনোনীত করা হয়। যা দলীয় গঠনতন্ত্রের লংঘন।
নূর উদ্দিন চৌধুরী নয়নের বিরুদ্ধে আতœীয়করণের অভিযোগ প্রচুর। নিজ শ্রী লুবনা চৌধুরীকে বানিয়েছেন সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক। নিজের ভগ্নিপতি মামুনুর রশিদকে বানিয়েছেন রায়পুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। আর ফুফা শ্বশুর হাজী ইসমাইল খোকনকে বানিয়েছেন রায়পুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক ও পৌর মেয়র। শ্যালক গোলাম আজম রায়পুর পৌর যুবলীগের আহ্বায়ক ও একইসঙ্গে ১০নং রায়পুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতিও। একই ব্যক্তি যুবলীগের আহ্বায়ক এবং আওয়ামী লীগের সভাপতি। আতœীয়করণের কি বাহারি নমুনা! তার আরেক শ্যালক শফিউল আজম চৌধুরী সুমন ১০ নং রায়পুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান। ভাগ্নে হুমায়ুন কবির ৪নং চররহিতা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। নয়ন চৌধুরীর ভাই আদনান চৌধুরী জেলা যুবলীগের সহ-সভাপতি।
অভিযোগ উঠেছে জেলার এক শীর্ষ নেতা কম্বল, পাঞ্জাবী এবং যাকাতের টাকা ও শাড়ির জন্য বিভিন্ন জায়গায় দারস্থ হন। শীর্ষ এক নেতার অযোগ্যতার ও ব্যর্থতার কারণে গত উপজেলা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর শোচনীয় পরাজয় ঘটে। জেলা সভাপতি গোলাম ফারুক পিংকুর থানা চন্দ্রগঞ্জ। ৪ বছর পূর্বে এ থানা গঠন করা হলেও কোনো প্রকার সাংগঠনিক কমিটি গঠন করতে পারেনি জেলা সভাপতি। মাত্র কয়েকদিন আগে গঠন করা হয়েছে এক সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি। সূত্রে জানা গেছে, আহ্বায়ক হলেন হাজির পাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কাশেম চৌধুরী। এই চৌধুরীকেই উপজেলা চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন প্রদান করে। দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে বিপুল ভোটে হেরে যান তিনি। তার পদত্যাগের ফলে তার ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে উপ নির্বাচনে তারই ছেলে মিজানুর রহমান চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও হেরে যান। এখানে দলীয় নেতাকর্মীরা সভাপতির ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন। অভিযোগ উঠেছে দলের পদ-পদবী বাণিজ্যের পাশাপাশি দলের শীর্ষ নেতারা মনোনয়ন বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
বিভিন্ন সূত্রমতে, দল ক্ষমতা থাকার সুবাদে বিভিন্ন কৌশলে জেলার শীর্ষ নেতারা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে বিলাসী জীবনযাপন করেন। এসব নেতা দেশ ও দেশের বাহিরে বিলাস বহুল বাড়ি করেছেন এবং কোটি টাকার দামী গাড়ি হাকিয়ে চলেন। জেলা পর্যায়ে শীর্ষ নেতারা নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তনে ব্যস্ত থাকলেও জেলা আওয়ামী লীগের জন্য একটি কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। জেলা সভাপতি সম্পাদকের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে পৃথক পৃথকভাবে দলের ঘরোয়া কর্মসূচিগুলো পালিত হয়। জেলা কমিটিও এখন মেয়াদোত্তীর্ণ। ৬ মার্চের মধ্যে জেলা সম্মেলন করার কেন্দ্রীয় নির্দেশনা থাকলেও কোনো ধরনের প্রস্তুতি নেই জেলা কমিটির। অভিযোগ উঠেছে কৌশলে জেলা সম্মেলন এড়িয়ে গিয়ে জেলা নেতৃত্ব ব্যস্ত বিভিন্ন ওয়ার্ড এবং ইউনিয়নে তাদের মনগড়া কমিটি গঠন করতে। দীর্ঘ ১৭ বছর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের কোনো সম্মেলন হয়নি। গঠনতন্ত্র উপেক্ষা করে সম্প্রতি সদর উপজেলাকে সাংগঠনিকভাবে দুইভাগে (পূর্ব ও পশ্চিম) বিভক্ত করে দুটি কমিটি গঠন করে জেলা কমিটি। জেলা কমিটি এ কমিটিগুলোকে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি হিসেবে উল্লেখ করছে। পশ্চিম শাখার আহ্বায়ক পদে জেলা সাধারণ সম্পাদকের ভাগ্নে হুমায়ুন কবির পাটোয়ারীকে নির্বাচিত করা হয়। কথিত এ কমিটি গঠন প্রসঙ্গে সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বিজন বিহারী ঘোষ নোয়াখালী প্রতিদিনকে জানান, জাতীয় সম্মেলনকে সামনে রেখে গত ৩ ডিসেম্বর জেলা আওয়ামী লীগ এক মিটিং ডাকে। এ মিটিং কিভাবে জাতীয় সম্মেলনে যোগদান করবে তার জন্য ২টি কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটিগুলো কোনো মতেই সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি নয়। রায়পুর থানা আওয়ামী লীগে ১৯ বছর আগে সম্মেলন হয়েছে। কমিটির সভাপতি তোজাম্মেল হোসেনসহ ১৮ জন নেতা মারা গেছেন। পরে স্বজনপ্রীতিতে মামুনুর রশিদকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বানানো হয়। কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল খোকন পৌরমেয়র ও জেলার সাধারণ সম্পাদককে ফুফা শ্বশুর। এখানে সাংগঠনিক কাজে অগ্রগতি নেই বললেই চলে। রায়পুর পৌর কমিটির ও সম্মেলন হচ্ছে না ২২ বছর ধরে। একই অবস্থা রামগতি ও কমলনগর উপজেলা, সব পৌরশহরসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন কমিটির। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, সুবিধাবাদীদের দৌরাতেœ্য এ জেলায় ত্যাগীরা বঞ্চিত হচ্ছে। পদ-বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির টাকায় জেলার অনেক নেতা কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। তারা এখন বিলাসী জীবনযাপন করছেন।
রামগতি উপজেলার বড়খেরি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সম্মেলনে নিজের পছন্দসই নয়ন নামে এক ব্যক্তিকে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আনতে না পেরে জেলা সভাপতি গোলাম ফারুক পিংকু নেপথ্য ইঙ্গিতে কয়েকবার সম্মেলন স্থগিত হয়ে যায়। এমন অভিযোগ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের। এই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সম্মেলন নিয়ে ইউনিয়নের নেতারা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ হোসেনের সাথে দেখা করে অভিযোগ করেন। শেষমেশ শুক্রবার এই ইউনিয়নের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। জানা গেছে, জেলা সভাপতি পছন্দসই ব্যক্তি সভাপতি বা সম্পাদক কোনো পদেই নির্বাচিত হননি।
বিভিন্ন সূত্রমতে, দল ক্ষমতায় থাকার সুবাদে আওয়ামী লীগকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী মনে হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন ক্ষমতার বাহিরে এ জেলার আওয়াম ীলীগ অনেকটা নিঃ®প্রাণ। তৃণমূল থেকে জেলা পর্যন্ত কোথাও নেতৃত্বের বিকশিত হচ্ছে না। জি হুজুর ইয়েস হুজুর মার্কা ব্যক্তিরাই মূলত দলের পদ-পদবীগুলো দখল করে নিচ্ছে। ত্যাগী নেতা-কর্মীদের পদ পদবীর বাহিরে রাখা হয়েছে। নেতা-কর্মীদের মতে এতে আওয়ামী লীগ সাধারণ জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।
দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের দাবী ভবিষ্যতে যেকোন বিপর্যয় এড়াতে দলের সাংগঠনিক শক্তির বিকল্প নেই। লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগ এবং জেলার তৃণমূল আওয়ামী লীগকে সু-সংগঠিত ও শক্তিশালী করতে জেলা সম্মেলনের মাধ্যমে কর্মীবান্ধব নেতৃত্বের হাতে জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বকে ছেড়ে দিতে হবে। এই মূহুর্তে দলের তৃণমূলের কোনো পর্যায়ের সম্মেলন নয়, নেতাকর্মীদের দাবি জেলা সম্মেলন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close