বিশেষ সংবাদসারাদেশস্বাস্থ্য

হোম কোয়ারেনটাইন নিয়ম ভেঙে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যার সাথে একই অনুষ্ঠানে সাবেক মেয়র কামরান

ডেক্স রিপোর্ট ; নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) উপদ্রুত এলাকা থেকে এলে বাধ্যতামূলকভাবে ১৪ দিনের হোম কোয়ারেনটাইনে থাকার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের। সে নিয়ম ভাঙলে জেল-জরিমানার বিধানও আছে, যা দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রয়োগ করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে সেই নিয়ম ভেঙেছেন সিলেটের সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সদস্য বদরউদ্দিন আহমেদ কামরান। করোনাভাইরাস উপদ্রুত যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফিরে একদিনের বিরতিতে তিনি এসেছেন ঢাকায়। ধানমন্ডিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে। একই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা!

সাবেক একজন মেয়র ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে বদরউদ্দিন কামরানের এমন আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। তবে কামরান বলছেন, বিমানবন্দরে অবতরণ করার পর তাকে কোয়ারেনটাইনে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তবে সিভিল সার্জনসহ দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, একজন সচেতন ব্যক্তির এ ধরনের কার্যক্রম দুর্ভাগ্যজনক।

বদরউদ্দিন কামরানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি যুক্তরাজ্যে যান। প্রায় একমাস তিনি অবস্থান করেন লন্ডন শহরে। গত ১৫ মার্চ তিনি দেশে ফেরেন। কামরানের দেওয়া তথ্যই বলছে, তিনি যখন লন্ডনে অবস্থান করছিলেন, ওই সময় যুক্তরাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস। এমনকি লন্ডনেও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন একাধিক ব্যক্তি।

এ অবস্থায় ১৫ মার্চ দেশে ফিরে একদিন পরই গতকাল মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানাতে যান বদরউদ্দিন কামরান। পরে নিজেই ফেসবুক পোস্টে ছবি দেন সে অনুষ্ঠানে। লিখেন, ‘আওয়ামী লীগ সভাপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন জননেত্রী শেখ হাসিনা দলীয় নেতাকর্মীসহ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন।’ এসব ছবিতে পেছনের সারিতে কামরানকেও দেখা যায়।

শুধু তাই নয়, আজ বুধবারও (১৮ মার্চ) সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বদরউদ্দিন কামরান। অনুষ্ঠানে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদসহ জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের নেতারা উপস্থিত ছিলেন এই অনুষ্ঠানে।

 

দেশে ফিরে যেখানে তার হোম কোয়ারেনটাইনে থাকার কথা, সেখানে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের অনুষ্ঠানে যোগদান করা বিষয়ে বুধবার (১৮ মার্চ) রাতে জানতে চাওয়া হয় বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের কাছে। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আমাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কোনো সমস্যা না পাওয়ায় ছেড়ে দেওয়া হয়। এ সময় আমাকে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তাই আমি আসলে এতে খুব একটা সমস্যা দেখছি না।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে বিদেশ ফেরতদের বাধ্যতামূলক হোম কোয়ারেনটাইনে থাকতে বলা হয়েছে— এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সাবেক এই মেয়র বলেন, আমার কোনো শারীরিক সমস্যা যেহেতু তারা পায়নি, তাই এতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সংক্রমিত হওয়ার ১৪ দিন পরও করোনাভাইরাসের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই উপদ্রুত এলাকা থেকে ফিরলে ১৪ দিন পর্যন্ত বাধ্যতামূলকভাবে কোয়ারেনটাইনে থাকতে বলেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। সেক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি থাকছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে কামরান বলেন, আমাকে বিমানবন্দরে যারা স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছেন, তারা হোম কোয়ারেনটাইনে থাকার কোনো নির্দেশনা দেননি। আর তাই আসলে আমি এতে কোনো ঝুঁকি দেখি না। তারা (স্বাস্থ্য বিভাগ) যে ফরম দিয়েছেন, তা পূরণ করেছি। আর বিমানবন্দরে চেকআপও করেছে। করোনার যেসব উপসর্গ, সেগুলোর কিছুই আমার মধ্যে নেই। তাই আমার মনে হয় না এতে খুব বেশি সমস্যা হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেট জেলা সিভিল সার্জন কর্মকর্তা ডা. প্রেমানন্দ মণ্ডল সারাবাংলাকে বলেন, দেশের বাইরে থেকে আসা সবাইকে হোম কোয়ারেনটাইনে থাকার নির্দেশনা দেওয়া আছে। এ ক্ষেত্রে সাবেক মেয়র মহোদয়ের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। তবে তিনি বিশিষ্ট ব্যক্তি বলে হয়তো কেউ বিমানবন্দরে সাহস করে বলতে পারেননি। আর আমরা হেলথ চেকআপ করে সবাইকে একটা হেলথ কার্ড দিচ্ছি। সেখানে পরিষ্কারভাবে হোম কোয়ারেনটাইনে থাকার বিষয়টি লেখা আছে। তারপরও আমরা খোঁজ-খবর নিয়ে দেখছি।

 

সিলেট জেলার স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক ডা. দেবপদ রায় সারাবাংলাকে বলেন, বদরউদ্দিন কামরান সাহেব কবে এসেছেন, তা আমার জানা নেই। তিনি যদি আইন প্রয়োগের নির্দেশনার আগে এসে থাকেন, তবে আমাদের কিছু বলার নেই। যদি তিনি সেই সময়ের পরে এসে থাকেন, তবে হোম কোয়ারেনটাইন নিশ্চিত করার জন্য সিলেটে যে কমিটি গঠন করা হয়েছে, তার প্রধানদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। সেখানে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার দায়িত্বে আছেন।

এ বিষয়ে জানতে সিলেটের জেলা প্রশাসক এম কাজি এমদাদুল ইসলামের মোবাইলে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভড করেননি। মোবাইল এসএমএসেরও কোনো উত্তর দেননি। তবে সিলেট জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, সাবেক মেয়র একজন সচেতন নাগরিক। তাকে আর নতুন করে সচেতন করার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। পত্র-পত্রিকার মাধ্যমেও বর্তমান অবস্থা আসলে জানা যায়। আমরা এক্ষেত্রে আসলে এটাকে দুর্ভাগ্যজনক ছাড়া আর কিছু বলতে পারছি না।

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন ও প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ সারাবাংলাকে বলেন, বিষয়টি অবশ্যই আশঙ্কাজনক ও ঝুঁকিপূর্ণ। আমি আগামীকাল অবশ্যই বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে জানাব। সুত্র… সারাবাংলা

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close